কলকাতা, সোমবার ২৩ জানুয়ারি ২০১৭, ৯ মাঘ ১৪২৩

রবিবার | রেসিপি | আমরা মেয়েরা | দিনপঞ্জিকা | শেয়ার | রঙ্গভূমি | সিনেমা | নানারকম | টিভি | পাত্র-পাত্রী | জমি-বাড় | ম্যাগাজিন

স্বামীজী

তিনটি ঘটনা নৈনিতালকে মধুময় করিয়া তুলিয়াছিল— খেতড়ীরাজকে আমাদের নিকট পরিচিত করিয়া দিয়া আচার্যদেবের আহ্লাদ, দুইজন বাইজীর আমাদিগের নিকট সন্ধান জানিয়া লইয়া স্বামীজীর নিকট গমন এবং অন্যের নিষেধ সত্ত্বেও স্বামীজীর তাহাদিগকে সাদরে অভ্যর্থনা করা, আর একজন মুসলমান ভদ্রলোকের এই উক্তি: ‘‘স্বামীজী, যদি ভবিষ্যতে কেহ আপনাকে অবতার বলিয়া দাবি করেন, স্মরণ রাখিবেন যে আমি মুসলমান হইয়াও তাঁহাদের সকলের অগ্রণী।’’
আর এইখানেই, এই নৈনিতালেই স্বামীজী রাজা রামমোহন রায় সম্বন্ধে অনেক কথা বলেন, তাহাতে তিনি তিনটি বিষয় এই আচার্যের শিক্ষার মূলসূত্র বলিয়া নির্দেশ করেন: তাঁহার বেদান্তগ্রহণ, স্বদেশপ্রেম-প্রচার এবং হিন্দুমুসলমানকে সমভাবে ভালবাসা। এই সকল বিষয়-এ রাজা রামমোহন রায়ের উদারতা ও ভবিষ্যদ্দর্শিতা যে কার্যপ্রণালীর সূচনা করিয়াছিল, তিনি নিজে মাত্র তাহাই অবলম্বন করিয়া অগ্রসর হইয়াছেন বলিয়া দাবি করিতেন।
নর্তকীদ্বয়-সংক্রান্ত ঘটনাটি আমাদের নৈনি-সরোবরের উপরে অবস্থিত মন্দিরদ্বয়দর্শন-উপলক্ষে ঘটিয়াছিল। এই দুইটি মন্দির স্মরণাতীত কাল হইতে তীর্থরূপে রম্য ‘নৈনিতালে’র পবিত্রতা সম্পাদন করিয়া আসিয়াছে। এইস্থানে আমরা দুইজন বাইজীকে পূজায় রত দেখিলাম। পূজান্তে তাহারা আমাদের নিকট আসিল এবং আমরা ভাঙা ভাঙা ভাষায় তাহাদের সহিত আলাপ করিতে লাগিলাম। আমরা তাহাদিগকে নৈনিতাল শহরের কোন সম্ভ্রান্ত বংশের রমণী বলিয়া ভুল করিয়াছিলাম, এবং স্বামীজী তাহাদিগকে তাড়াইয়া দিতে অস্বীকার করায় উপস্থিত জনমণ্ডলীর মনোমধ্যে যে একটা আন্দোলন চলিয়াছিল তাহা তখন লক্ষ্য না করিলেও পরে জানিতে পারিয়া অতীব বিস্মিত হইয়াছিলাম। আমার যতদূর স্মরণ হয়, খেতড়ীর বাইজীর যে গল্প তিনি বারংবার করিতেন তাহা প্রথমবার সম্ভবতঃ এই নৈনিতালের বাইজীদের প্রসঙ্গেই বলিয়াছিলেন। খেতড়ীর সেই বাইজীকে দেখিতে যাইবার নিমন্ত্রণ পাইয়া তিনি ক্রুদ্ধ হইয়াছিলেন, কিন্তু পরিশেষে অনেক অনুরোধে তথায় গমন করেন এবং তাহার সঙ্গীত শ্রবণ করেন। ...
অতঃপর আচার্যদের নিজ মুখে বলিয়াছেন, যেন তাঁহার চক্ষের সম্মুখ হইতে একটি পর্দা উঠিয়া গেল এবং সবই এক বই দুই নহে— এই উপলব্ধি করিয়া তিনি তারপর আর কাহাকেও মন্দ বলিয়া দেখিতেন না। [এই মন্দির-দর্শন-সংক্রান্ত ঘটনাটি পরে জয়া অপর একজনের নিকট শ্রবণ করেন, বক্তা তখন সমবেত স্ত্রীমণ্ডলীকে ওজস্বিনী হৃদয়স্পর্শিনী ভাষায় উপদেশ দিতেছিলেন— সে ভাষা প্রেম ও কোমলতাপূর্ণ ছিল; উহাতে সকলের প্রতি সমদৃষ্টির ভাব বিদ্যমান ছিল, তিরস্কারের চিহ্নমাত্র ছিল না।]
যখন আমরা নৈনিতাল হইতে আলমোড়া যাত্রা করিলাম তখন বেলা পড়িয়া আসিয়াছে এবং বনপথ অতিবাহন করিতে করিতেই রাত্রি হইয়া গেল। আমরা রাস্তা ধরিয়া বরাবর চলিতে লাগিলাম; রাস্তা কোথাও খুব নিচু (তথায় জলস্রোতে খাদ পড়িয়া গিয়াছে), তাহার পরই আবার উঁচু; কোথাও আবার কোণা-বাহির করা পাহাড় ঘুরিয়া গিয়াছে; কিন্তু সর্বত্রই বিশালদ্রুমরাজিচ্ছায়াবহুল। ব্যাঘ্র-ভল্লু কাদি দূরে রাখিবার জন্য সমস্ত পথ আমাদের আগে আগে মশাল ও লন্ঠন চলিয়াছে। যতক্ষণ বেলা ছিল, আমরা গোলাপবন, ঝরণার আশেপাশে সরু সরু পাতাওয়ালা একজাতীয় ফার্‌ন্‌ এবং বন্য দাড়িম্বের ঝোপে লাল লাল কুঁড়িগুলি দেখিতে দেখিতে চলিয়াছিলাম; কিন্তু নিশাগমে ইহাদের এবং হনিসাক্‌লের কেবল গন্ধই আমাদের অবশিষ্ট রহিল।

ভগিনী নিবেদিতার ‘স্বামীজীর সহিত হিমালয়ে’ থেকে 






?Copyright Bartaman Pvt Ltd. All rights reserved
6, J.B.S. Haldane Avenue, Kolkata 700 105
 
Editor: Subha Dutta