কলকাতা, সোমবার ২৩ জানুয়ারি ২০১৭, ৯ মাঘ ১৪২৩

রবিবার | রেসিপি | আমরা মেয়েরা | দিনপঞ্জিকা | শেয়ার | রঙ্গভূমি | সিনেমা | নানারকম | টিভি | পাত্র-পাত্রী | জমি-বাড় | ম্যাগাজিন

প্রস্তাব ও বাস্তব

শনিবার কলকাতায় শেষ হল তৃতীয় বিশ্ব বঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলন। এই বেঙ্গল গ্লোবাল বিজনেস সামিট থেকে বাংলা বাস্তবে কী কতখানি পাবে বা পেতে চলেছে তা জানার জন্য আগ্রহ রয়েছে বস্তুত সারা দেশের। এর কারণ একাধিক। ৩৪ বছরের বাম শাসনে বাংলা শিল্পে বিশ্রীভাবে পিছিয়ে পড়েছে—এমনই বদনাম নিয়ে ২০০৬ সালে বিদায় নিয়েছিল সিপিএম তথা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সরকার। তবে বাংলা শাসনের দায়িত্ব যিনি পেয়েছেন সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গায়েও শিল্প-বিরোধী তকমাটি সেঁটে দিতে ব্যাকুল সিপিএম। তবু ২০১১ সালেও পুনর্বহাল হয়েছেন মমতা। এমনকী তাঁর ভক্ত সমর্থকরা মনে করেন, আগামীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পক্ষে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই এই মুহূর্তে সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তিত্ব। নোট বাতিলের ঘটনাকে সামনে রেখে মমতা আপাতত সেইভাবে নিজেকে মেলে ধরতেও সচেষ্ট রয়েছেন বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। ওইসঙ্গে তাঁর সরকার পশ্চিমবঙ্গের ‘উন্নত’ আইনশৃঙ্খলা ও গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি, বিকাশমান সুস্থ সংস্কৃতি এবং অঞ্চল ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকলের উন্নয়নের খতিয়ান তুলে ধরার উপর জোর দিয়েছে, যাতে সর্বভারতীয় স্তরে তৃণমূল সুপ্রিমোর গ্রহণযোগ্যতার দাবিটি মান্যতা পায়। ব্যাপারটিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং তাঁর দল বিজেপিও যে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছেন তাও স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে তাঁদের সাম্প্রতিক একাধিক তৎপরতায়। এই পরিস্থিতিতেই গত ১০-১৩ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হল অষ্টম ভাইব্রান্ট গুজরাত। যেখানে ২৫ হাজারের বেশি ‘মউ’ স্বাক্ষর হয়েছে এবং অন্তত ২৫ লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব পাওয়া গিয়েছে বলে তাদের দাবি। বলা বাহুল্য যে, গুজরাত রাজ্যের জন্য এই শিল্প আবাহনী সভাটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি নিজস্ব উদ্যোগ এবং যার সাফল্য-ব্যর্থতার সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে একান্তভাবে তাঁরই নাম। স্বভাবতই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বেঙ্গল গ্লোবাল বিজনেস সামিট সমাপ্তির পর সংশ্লিষ্ট মহলে এই প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে যে, কে কাকে কয়টি গোল দিলেন।
হয়তো এই কথাটি মাথায় রেখেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বিশ্ব বঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলনের মুধর সমাপ্তি রেখাটি আঁকতে চেয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, কলকাতায় এই দু’দিনের সম্মেলন থেকে বাংলার প্রাপ্তি হয়েছে ২ লক্ষ ৩৫ হাজার ২৯০ কোটি টাকার শিল্প-বাণিজ্য প্রস্তাব। টাকার অঙ্কে এটি গত বছরের তুলনায় কিঞ্চিৎ কমই বটে। তবু তিনি খুশি। আর তা এতটাই যে, এই সম্মেলনকে তিনি ‘সুপার সাকসেসফুল’ বলেই ঘোষণা করেছেন। নরেন্দ্র মোদির আচমকা বিমুদ্রাকরণের ভয়ংকর ধাক্কার মাঝেও এই সাফল্য তাঁকে গর্বিতও করেছে। গুজরাত বা অন্য-কোনও রাজ্যের নাম না নিয়ে মমতা দাবি করেছেন, তাঁর দাবিটি কোনওভাবেই ফোলানো-ফাঁপানো নয়, একেবারে নির্ভেজাল। তাঁর আরও দাবি, গত দুটি বাণিজ্য সম্মেলন থেকে বাংলা যত প্রস্তাব পেয়েছিল তার ৪০ শতাংশই বাস্তবায়নের নানা স্তরে রয়েছে। এই প্রসঙ্গে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতার তুলনাও টেনেছেন। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিনিয়োগের সাড়া পাওয়া গিয়েছে ২৯টি দেশ থেকে। সবচেয়ে বেশি প্রস্তাব এসেছে উৎপাদন শিল্পে—৬১ হাজার ৭৬৬ কোটি টাকার। এর পরেই আছে ছোট ও মাঝারি শিল্প, নগরোন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, উদ্যানপালন, মৎস্য ক্ষেত্র, পরিবহণ, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, খনি, আর্থিক ক্ষেত্র প্রভৃতি। শিল্পপতিদের নিজেদের মধ্যেও ৪২৫টি বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এই ধরনের আলোচনা থেকেও ভবিষ্যতে কিছু ভালো শিল্প প্রস্তাব আসবে বলে মুখ্যমন্ত্রী আশা করেন।
সত্যিই তো শুধুমাত্র কাগুজে সাফল্যের মূল্য কী। কী হবে নিছক কিছু ‘প্রস্তাব’ পেয়ে? কোনও হুজুগে পড়ে কিংবা কারও প্রভাব উপেক্ষা করতে না-পেরে যদি কোথাও গাদা গাদা বিনিয়োগ প্রস্তাব এসে পড়ে, তবে কোনও লাভ নেই। প্রস্তাবের মধ্যে আন্তরিকতা ও সারবস্তু থাকাটাই জরুরি। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি মতো বাংলার ক্ষেত্রে সেটিই যদি হয়ে থাকে তো বাংলা সত্যিই লাভবান হবে। গত দু’বারের মতো কিয়দংশ (৪০ শতাংশ) প্রস্তাব বাস্তবায়নের আশাতেই সন্তুষ্ট হলে আর চলবে না, এবার পাওয়া প্রস্তাবের সবগুলিকেই বাস্তবরূপ দেওয়ার জন্য সরকারকে সচেষ্ট হতে হবে। রাজনৈতিক অস্থিরতার দৃষ্টান্ত কিংবা শিল্পস্থাপনে বাধার নজির সামনে রেখে এই স্বপ্নপূরণ হওয়া কিন্তু কঠিন। তাই সবার আগে ভাঙড়ের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি রুখতে হবে। প্রশাসনের সমস্ত স্তরকে রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে সমন্বয়নের সুরে বেঁধে ফেলতে পারাটা আজ জরুরি। তবেই বহু টাকা ও উদ্যম খরচ করে এই ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন সার্থক হবে। শিল্প-বন্ধ্যত্ব এবং ক্রমবর্ধমান বেকারির অভিশাপ থেকে বাংলাকে মুক্ত করার ভিন্ন উপায় আপাতত অজানা।






?Copyright Bartaman Pvt Ltd. All rights reserved
6, J.B.S. Haldane Avenue, Kolkata 700 105
 
Editor: Subha Dutta