উত্তমদা চড়ুই বল ডাকতেন


অভিনেত্রী গীতা দে’র হাত ধরে তাঁর অভিনয় জগতে প্রবেশ। তখন বয়স মাত্র ৮। প্রথম অভিনয় করেন নাটকে, ছোট্ট ছেলের চরিত্রে। বড় বড় দিকপাল শিল্পীর থেকে পেয়েছিলেন আদর, প্রশ্রয় আর ভালোবাসা। নাটক থেকে ক্রমে ফিল্মে এবং ছোট পরদায় মেলে ধরেছেন নিজেকে। যুগের প্রয়োজনে নিজেকে বদলেছেন, কিন্তু মানুষটা একইরকম রয়ে গিয়েছেন। তিনি রত্না ঘোষাল। অজয় মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় উজাড় করলেন নিজেকে।

 গীতা দে’র সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ ঘটল?
 উনি ছিলেন আমার দিদির ননদ। সেই সূত্রে আলাপ। বড়দিই (গীতা দে’কে ওই নামে ডাকতাম) প্রথম আমার অভিনেত্রী সত্তাকে আবিষ্কার করেন। ৬২ সালের কথা, তখন আমি নিতান্তই নাবালিকা। গীতা দে শিখিয়ে পড়িয়ে একটা অ্যামেচার থিয়েটারে নিয়ে গেলেন। নাটকটি ছিল ‘শাহজাহানের সিপার’। আমি সিপার, মানে ছোট্ট একটি ছেলের চরিত্রে অভিনয় করলাম। সেই শুরু।
 এরপরই কি পেশাদার থিয়েটারে সুযোগ?
 আমার অভিনয়ের প্রশংসা হয়। এরপর রঙমহলের ‘স্বীকৃতি’ নাটকে অভিনয়। পরিচালক ছিলেন সলিল সেন। এখানেও আমি ছোট্ট ছেলের পার্ট করতাম। এরপর ‘বাবা বদল’ নাটকে ছোট্ট মেয়ের চরিত্রে অভিনয়। ‘উত্তরণ’ নাটকে পরিপূর্ণ নারী চরিত্র। ৭১-৭২ সাল হবে। এরপর ‘রামমোহন’ এবং তারপর ‘বিবর’এ রবিদার (ঘোষ) ডিরেকশনে কাজ করলাম।
 কেমন ছিল রবি ঘোষের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা?
 ভীষণ ভালো মানুষ ছিলেন, একই সঙ্গে মজার মানুষও ছিলেন। পরিচালনার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সিরিয়াস। কিন্তু বকাঝকা বা রাগ করতেন না। সব কিছু ধৈর্য ধরে বুঝিয়ে দিতেন।
এইভাবে করলে কী সুবিধা, বা ওইভাবে করলে কী অসুবিধা সব জলের মতো বুঝিয়ে দিতেন। রবিদা’র সঙ্গে পরে, ‘অলীকবাবু’, ‘পেটো পাঁচু’ ইত্যাদি নাটকে অভিনয় করেছি।
 বাংলা ব্যবসায়িক নাটকের ইতিহাসে ‘নহবত’ হল মাইলস্টোন, যার নায়িকা আপনি ছিলেন। কীভাবে সুযোগ এল?
 আমাদের একটা দল ছিল—‘ইঙ্গিত’। সেই দলে সত্যদা (বন্দ্যোপাধ্যায়), বুড়োদা (তরুণকুমার) এঁরা ছিলেন। ‘নহবত’ নিয়ে সত্যদা একেবারে তৈরি। কথাবার্তা চলছে তপন থিয়েটার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। প্রথমে আমি রমা মানে কনের পার্টটা করতাম। সেটা ছিল ৭৫ সাল। দীর্ঘ আট বছর সাফল্যের সঙ্গে চলার রেকর্ড বোধহয় আর কোনও নাটকের ক্ষেত্রে নেই। পরে আমাকে কেয়া অর্থাৎ নায়িকার পার্ট দেওয়া হল।
 কেমন ছিলেন সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়?
 ‘ইঙ্গিত’-এ থাকাকালীন ওঁর সান্নিধ্যে আসতে পেরেছিলাম। অভিনয়টা চমৎকার শেখাতে পারতেন। একটা গ্রুপ তৈরি করতে এবং সেটা সুষ্ঠুভাবে চালাতে যে মানসিকতার দরকার, সেটা সত্য’দার ছিল। কেয়া চরিত্রটা কেমন, কীভাবে করতে হবে উনি সেটা অত্যন্ত যত্ন নিয়ে শিখিয়েছিলেন। অনেক পরে, আমি চরিত্রটা নিয়ে ইম্প্রোভাইজ করতাম, উনি সেটা মেনে নিতেন এবং তারিফও করতেন। ভুল হলে অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে বলতেন।
 আর তরুণকুমার?
 বুড়োদার (তরুণকুমার) সম্পর্কে একটা মজার ঘটনার কথা বলি। মানুষটা তো ভীষণ হাসিখুশি ছিলেন, খেতেও ভালোবাসতেন। আমার বাড়িতে তখন ওঁর নিত্য যাওয়া আসা। একদিন ওই রকম এসেছেন। এসেই হুকুম করলেন, আমাকে খেতে দে। আমার ড্রয়িং রুমে তখন একটা সোফা-কাম-বেড পাতা থাকত। বুড়োদা এসেই সেটার ওপর সটান হলেন। তারপর শুনি মড়মড় আওয়াজ। ছুটে এসে দেখি বুড়োদার বিশাল বপুর ভারে সোফা-কাম-বেড ভেঙে পড়েছে, বুড়োদা তার মাঝখানে আটকে।
 নহবত নিয়ে কোনও বিশেষ স্মৃতি আছে কি?
 একটা মজার ব্যাপার বলি। ‘নহবত’ এত হিট করেছিল যে সে সময় প্রচুর কল-শো’র ডাক আসত। এরকমই এক কল-শো’র জন্য ডায়মন্ডহারবারের কাছে কোনও এক গ্রামে এসেছি। উদ্যোক্তারা এসে জানাল, বিশাল ভিড়। দূরদূরান্ত থেকে আরও মানুষ আসছে। প্যান্ডেল ঘিরে রাখা যাবে না। সত্য’দা বললেন, যদি এরকম ভিড় হয়, তাহলে প্যান্ডেলের একটা দিক খুলে দিন। কিন্তু তাতেও সামাল দেওয়া গেল না। সে যেন মানুষের স্রোত। মানুষের পায়ের চাপে একজন মারা গেলেন। পুলিশ এসে হাজির। সে এক হইচই কাণ্ড। নাটক আর মঞ্চস্থ করা গেল না। এর পর থেকে যতবার কল’শো করতে গিয়েছি, ততবারই আগে থেকে পুলিশ মোতায়েন রাখা হত। এই ঘটনা এখনও পর্যন্ত একমাত্র নহবতের ক্ষেত্রেই ঘটেছে। আরও একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে।
 সেটা কী?
 খড়্গপুরের কাছাকাছি এক গ্রামে গিয়েছি। আমাদের একটি বাড়িতে রাখা হয়েছে। সেই সময় ‘মা লক্ষ্মী’ নামে একটি ছবিতে আমি মা লক্ষ্মী সেজেছিলাম। ছবিটা ওই সময়ই মুক্তি পেয়েছে। হঠাৎ শুনি, ওই বাড়ির সামনে অসংখ্য মহিলা ভিড় করেছে। তারা আমাকে, মানে মা লক্ষ্মীকে দেখতে চায়। বুড়োদা বললেন, মাটু তুই একবার বাইরে যা— তোকে দেখতে চাইছে। আমি গেলাম। সে এক কাণ্ড। বয়স নির্বিশেষে সবাই আমায় প্রণাম করল। তারপর বলল— আমাদের আশীর্বাদ কর মা। আমি যত বলি ওটা ছবি, আমি পার্ট করেছি। সে কথা কে শোনে। খুব অপ্রস্তুতে পড়ে গিয়েছিলাম।
 একবার এক বিদেশি মহিলা নাকি ‘নহবত’ দেখে খুব কেঁদেছিলেন?
 সেও এক ঘটনা। এক জার্মান মহিলাকে নিয়ে আমাদের পরিচিত এক ভদ্রলোক এসেছিলেন শো দেখতে। উনি, আলাপ করিয়ে দিতে, জানতে পারলাম ওই জার্মান মহিলা বাংলা নাটক নিয়ে থিসিস লিখছেন। নাটক শেষ হওয়ার পর সেই ভদ্রলোক এসে আমাকে বললেন, আপনি একবার ওঁর সঙ্গে দেখা করুন, উনি প্রচণ্ড কাঁদছেন। গিয়ে দেখি ভদ্রমহিলা হাউ হাউ করে কাঁদছেন। কেয়া’র দুঃখে এতটাই বিহ্বল হয়ে গিয়েছিলেন, যে ভুলেই গিয়েছিলেন ওটা বাস্তব নয়।
 উত্তমকুমার দেখেছিলেন ‘নবহত’?
 প্রথম শো’তেই তো ওঁর মা, মানে মাসিমা এসে দেখেছিলেন। দর্শকাসনে বসে উত্তমদার দেখাটা সম্ভবপর ছিল না। উনি সময় পেলেই চলে আসতেন সোজা গ্রিনরুমে। উইংসের পাশে বসে দেখতেন। আমার কাজের খুব প্রশংসা করেছিলেন। আমাকে ডাকতেন ‘চড়াই পাখি’ বলে।
 ‘নহবত’-এ বিকাশ রায়ের সঙ্গেও তো কাজ করেছিলেন। কেমন অভিজ্ঞতা?
 বড় মনের মানুষ ছিলেন। ভীষণ জ্বালাতাম। মনে আছে তখন শীতকাল। একদিন নহবতের রিহার্সালে বিকাশদা এক টিফিন বাক্স পাটিসাপটা নিয়ে এলেন। বউদি তৈরি করে দিয়েছিলেন। কিন্তু ওই ক’টা পাটিসাপটায় আমাদের কী হবে! বুড়োদা তো একাই অর্ধেক শেষ করে দিলেন। সেদিন শো-এর শেষে আমি বিকাশদার কাছে গিয়ে বললাম—কালকে বউদিকে বলবে আরও বেশি করে পাটিসাপটা করে দিতে। ব্যস আর যায় কোথায়! খুব গালমন্দ করলেন। আবার পরদিন পাটিসাপটাও ঠিক নিয়ে এলেন। আমাকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। ভদ্রলোকের অসম্ভব নিয়মানুবর্তিতা ছিল। নাটক শুরু হত সাড়ে ছটায়, উনি আসতেন ঠিক সাড়ে পাঁচটায়। কোনওদিনই দেরি হতে দেখিনি।
 সরযূবালাদেবীর সঙ্গেও তো কাজ করেছেন, তাই না?
 হ্যাঁ। তখন আমি ছোট, ছেলের পার্ট করতাম। সরযূমা (সরযূবালা) আমাকে শেখাতেন কীভাবে হাঁটতে হয়, ডায়লগ থ্রো করতে হয়। মনে আছে পরের দিকে রঙমহলে যখন লুৎফা করছি, তখন উনি আমাকে অভিনয়ের নানান দিক শিখিয়েছিলেন। পুজোর সময় যখন শো হত, উনি তখন কতরকমের খাবার কিনে এনে খাওয়াতেন। লক্ষ্মীপুজোয় বাড়ি থেকে প্রচুর প্রসাদ নিয়ে আসতেন। আরও একজন মানুষ আমাকে ভীষণ কেয়ার করতেন।
 কে?
 জহর গাঙ্গুলী। একসঙ্গে কল-শো করতে গেলে, সবসময় খোঁজ করতেন। কোথায় যাচ্ছিস, কার সঙ্গে যাচ্ছিস— সব খবর রাখতেন। আমি ঠিকমতো খাচ্ছি কি না সেটাও খেয়াল রাখতেন।
 আর ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়?
 ভানুদাকে প্রতিদিন ফোন করতে হত। যদি কয়েকদিন গ্যাপ হয়ে যেত, তাহলে নিজেই ফোন করে প্রচণ্ড বকাঝকা করতেন। বলতেন, ব্যাপার কী রে। একটা ফোন করতে পারিস না।
 আচ্ছা সেই সময় অর্থাৎ ৭৫-৮২ সালে, যখন কমার্শিয়াল নাটকের রমরমা, তখন মিস শেফালিরাও নাটকে জাঁকিয়ে বসেছেন। ক্যাবারে নাচের তখন খুব কদর।
 ওটা তো রাসবিহারী সরকার করেছিলেন। ওঁর নাটকেই ওইসব থাকত। তখন কমার্শিয়াল নাটক দেখতে এমনিই মানুষ ভিড় করত। তখন নাটক চলত গোটা পনেরো হলে, এবং রমরম করে।
 এখন নাটকের অবস্থা কেমন বলে মনে হয়?
 কমার্শিয়াল নাটক তো বন্ধই হয়ে গিয়েছে। হলগুলোও সব বন্ধ। তবুও গ্রুপ থিয়েটার এখন ভালো চলছে এটাই আশার কথা।
 এখনকার নাটক দ্যাখেন? কাদের কাজ ভালো লাগে?
 মেঘনাদ ভট্টাচার্য, কৌশিক সেনদের নাটক ভালো লাগে। আলাদা করে ভালো লাগে দেবশংকর হালদারকে। তবে কাজের চাপে বড় একটা নাটক দেখ হয় না। ভালো অফার পেলে আমিও নাটক করতে চাই।

ছবি : গোপাল দেবনাথ

অশনি নাট্যমের নাট্যোৎসব

‘কতটা পথ পেরোলে তবে পথিক বলা যায়, /কতটা পথ পেরোলে পাখি জিরোবে তার ডানা, / কতটা পথ অপচয়ের পর তবে মানুষ চেনা যায়, /প্রশ্নগুলো সহজ আর উত্তরটাও জানা। /কত হাজার মানুষ হারালে মানবে তুমি শেষে? /বড় বেশি মানুষ গেছে, বানের জলে ভেসে।’
কবীর সুমন অনূদিত বব ডিলানের এই বিখ্যাত গান দিয়ে শুরু হয়েছিল গড়িয়ার ‘অশনি নাট্যম’-এর ৩৯তম নাট্যোৎসব। প্রাক উদ্বোধনী বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা এবং প্রবেশদ্বারে মিষ্টি সহযোগে অতিথি আপ্যায়নের মাধ্যমে তারা নিজেদের স্বাতন্ত্র বজায় রেখেছিল। প্রতিদিন তিনটি করে মোট ২৩টি আমন্ত্রিত নাট্যদল মঞ্চস্থ করল তাদের নিজস্ব নাটক এবং সঙ্গে একদিন অবশ্যই উদ্যোক্তা সংগঠন।
১৯৭৮ থেকে ২০১৬, দীর্ঘ ৩৮ বছর ধরে নাট্যোৎসব আয়োজন করার পর আজও যখন ওই গান দিয়ে উৎসব শুরু হয় তখনই বোঝা যায় যে সংগঠকরা শুধুমাত্র উৎসবেই মেতে নেই, সত্যিকারের নাট্য-আন্দোলন গড়ে তোলায় ব্রতী হয়েছেন। সারা বছর ধরে সাধারণ মানুষকে নিয়ে তাঁদের যে নাট্যআন্দোলন, তার ফলস্বরূপ প্রথম দিন থেকেই উৎসবস্থল মানুষের ভিড়ে ঠাসা। যেখানে সরকারি নাট্যমেলা দর্শক উপস্থিতি নিয়ে আতঙ্কিত, সেখানে এই নাট্যোৎসবে দর্শকদের স্বতঃস্ফূর্ততা চোখে পড়ার মতো। কারণ, উদ্যোক্তারা শুধুমাত্র নিজের উৎসবের আয়োজনে ব্যস্ত না থেকে অন্যান্য আমন্ত্রিত নাট্যদলকে সাবলম্বী হতে সাহায্য করেন। সবশেষে যে খবর নাট্যপ্রেমী মানুষের মনের জোরকে বাড়িয়ে দেবে তা হল, সংগঠকরা সরকারি সাহায্য নেওয়ার বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক। তাই এই বিশাল আয়োজনের সমস্ত আর্থিক-ব্যয় তাঁরা সংগ্রহ করেন সাধারণ মানুষের দরজায় দরজায় গিয়ে এবং মানুষও সেখানে দরাজ। তাই সার্থক মানুষের এই নাট্যোৎসব। সার্থক হোক এই নাট্য-আন্দোলন।

পীযুষকুমার পাল















 



















 এবছরেও তো প্রায় গোটা দশেক নাটকের সঙ্গে যুক্ত আপনি ?
 হ্যাঁ। পাইকপাড়া ইন্দ্ররঙ্গ দলের হয়ে একটি নাটক পরিচালনা করছি। আমারই লেখা নাটক। নাম ‘বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী’। নৈহাটি ব্রাত্যজনের হয়ে একটি নাটক পরিচালনা করছি। নাটকটি আলেকজান্দ্রো ইনারিতুর সিনেমা ‘টোয়েন্টি ওয়ান গ্রামস’ অবলম্বনে লিখেছেন উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায়। নাম ‘২১ গ্রাম’। এছাড়া বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল আমার লেখা একটি নাটক করছে। সেটির নাম ‘অনুসোচনা’। বুদ্ধদেবের জীবনের একটি ঘটনা অবলম্বনে এই নাটকটি লেখা। তাই পালি ভাষার বানান অনুযায়ী নামটি লেখা হচ্ছে ‘দন্ত্য স’ দিয়ে। দেবাশিস দত্ত আমার একটি নাটক করছেন। দেবাশিস রায় করছেন আমার লেখা ‘হৃদিপাশ’ নামে একটি নাটক। সন্দর্ভ আমার লেখা একটি নাটক করবে। পূর্ব পশ্চিম করবে আমার লেখা একটি নাটক। পরিচালক প্রেমাংশু রায় আমার একটি নাটক চেয়েছেন। রবীন্দ্রনগর নাট্যায়ুধ আমার লেখা ‘জীবজন্তু’ নামে একটি নাটক করছে। আপাতত এই মনে পড়ছে।
 এত নাটক লিখছেন, পরিচালনা করছেন সময় পাচ্ছেন কখন? যেহেতু আপনি একজন মন্ত্রী এবং বিধায়ক তাই এই প্রশ্নটা এল।
 লেখালেখি আমি রাতেই বেশিরভাগ সময় করি। চেষ্টা করি রাত ৯টার মধ্যে বাড়ি ঢুকে যেতে। তারপর প্রতিদিন একটি করে সিনেমা দেখি। তারপর বইপড়া , লেখালিখি চলে। কখনও এমনও হয় যে ভোর চারটে পর্যন্ত লিখে, দু’ঘণ্টা ঘুমিয়ে তারপর ছ’টার সময় উঠে ফের লিখতে শুরু করেছি।
 এ তো অমানুষিক পরিশ্রম। শরীর খারাপ হয়ে যাবে!
 হ্যাঁ হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে এখনও পর্যন্ত শরীর বিদ্রোহ করেনি। এই কারণেই আমি ঠিক করেছি ৫০ বছর বয়স হয়ে গেলে আর থিয়েটার করব না।
 অন্য কিছু করবেন?
 ঠিক করিনি এখনও। তবে কিছু তো করবই। হয়তো ফিল্ম বানাবো।
 কিন্তু ৫০ বছর বয়সের পর নাটক ছেড়ে দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত কেন? শুধুই কি শরীরের জন্যে?
 না। আসলে আমাদের বাংলা থিয়েটারের পরিকাঠামোটা ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু হয়ে আসছে। আমি অনেক বিকল্প থিয়েটার স্পেসের সন্ধান করেছি। অনেক নতুন নতুন হল খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমার চাহিদা একটা নির্দিষ্ট হলে আমার মতো করে থিয়েটারটা করার। সেরকম কিছু তো পেলাম না। তাছাড়া চেষ্টা করেছিলাম একটা রেপার্টরি তৈরি করার। যাতে থিয়েটারের নিজস্ব অর্থনীতিটা জোরদার হয়। থিয়েটারের পয়সাতেই থিয়েটার করা যায়। সেটাও হল না।
 একসময় শম্ভু মিত্র জাতীয় নাট্যমঞ্চের জন্য পথে নেমেছিলেন। আপনিও সরকারের কাছে একটা নির্দিষ্ট হল চাইছেন না কেন?
 দেখুন আমি নিজেই যেখানে সরকারের অঙ্গ, সেখানে আমার পক্ষে চাওয়াটা নৈতিকভাবে ঠিক নয়। অন্যরা চাইতেই পারেন।
 থিয়েটার মহলে আপনার তো অনেক অনুগামী। তাঁরাই বা চাইছেন না কেন?
 অনুগামীরা সবাই লক্ষ্মীর সাধক, সরস্বতীর নয়। তাই তাঁরা চাইবেন না হয়তো।
 আপনি তো রীতিমতো হতাশাব্যঞ্জক কথা বলছেন।
 হ্যাঁ, আমারও বলতে গিয়ে যথেষ্ট ব্যাথা লাগছে। কিন্তু উপায় নেই। তবে হ্যাঁ কিছু পরিকল্পনা আমারও আছে... এখন দেখা যাক কী হয়। (কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে) আসলে দেখুন আমি একটা কথা বুঝেছি যে, আমাদের বাংলা থিয়েটারে চাহিদার তুলনায় যোগান বেশি। যতক্ষণ না পর্যন্ত নাটকের চাহিদা তৈরি হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত পরিস্থিতিটা এরকমই থাকবে। এখন যদি বাংলার সমস্ত থিয়েটারের দল ঠিক করে যে আর নাটক করবে না, তাহলে কি কারও কিছু যাবে-আসবে? আসলে আমরা যে কাজটা করি সেটা নিজের কারণেই করি, নিজের ভালোলাগা থেকেই করি।
 মুম্বইয়ে হিন্দি সিনেমার অনেক অভিনেতাই কিন্তু নিয়মিত থিয়েটার করেন। নাসিরুদ্দিন শাহ, সৌরভ শুক্লা, যশপাল শর্মা, পরেশ রাওয়াল, শরমন যোশি প্রমুখ। এঁদের দেখার আকর্ষণেও কিন্তু অনেক মানুষ ভিড় করেন থিয়েটারে। মুম্বইয়ে যে কারণে থিয়েটার বেশ লাভজনক। আমাদের এখানে সেরকম চেষ্টা করা যায় না কি? সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এখনও মঞ্চে অভিনয় করলে শো হাউজ ফুল হয়।
 দেখুন হিন্দি সিনেমার যেসব অভিনেতার নাম আপনি করলেন তাঁরা কিন্তু কেউই শাহরুখ বা সলমন নন। এঁরা সেই অর্থে স্টার নন। সেরিব্রাল অভিনেতা। কিন্তু তা হলেও এঁদের একটা স্টারভ্যালু আছে। আসলে মুম্বইয়ে তথাকথিত মশলা ছবি ছাড়াও অন্য ধরনের কিছু ছবি তৈরি হয়। যেসব ছবিতে ইরফান খান, নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকিরা অভিনয় করে নাম করেছেন। মুশকিল হল আমাদের বাংলা সিনেমায় কিন্তু এই দ্বিতীয় ধারাটা মোটেই শক্তিশালী নয়। তবু আমি ঋত্বিককে নিয়ে একটা চেষ্টা করেছিলাম।
 আপনি শুভাশিস মুখোপাধ্যায়কে নিয়েছেন, শতাব্দী রায়কে দিয়েও মঞ্চে অভিনয় করিয়েছেন।
 হ্যাঁ, ঠিকই। আসলে বাংলায় এই স্পেসটা তৈরি হয়নি এখনও। তাই যেটা মুম্বইয়ে পরেশ রাওয়াল কিংবা ওম পুরীকে নিয়ে হয় সেটা এখানে হয় না। আপনি যাঁদের নাম করেছেন তাঁরা সবাই কিন্তু থিয়েটার ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে সিনেমায় এসেছেন। আমাদের এখানে সেই ধারা নেই।
আর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ও কিন্তু মঞ্চেরই লোক। একটা বিকল্প ধারার সংস্কৃতি থেকে এসে তিনি মেইন স্ট্রিম সিনেমার স্টার হয়েছিলেন। তিনি যখন বাংলা মেইন স্ট্রিম সিনেমার হিরো তখনও কিন্তু মঞ্চে অভিনয় করেছেন। তাঁর সত্যজিৎ রায়, কান, ভেনিস ইত্যাদি ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল। সেটা মনে রাখবেন। এই বিকল্প সংস্কৃতির ধারাটা বাংলায় ক্রমশ শুকিয়ে এসেছে। তারই প্রভাব পড়ছে।
 বিকল্প সংস্কৃতির এই ধারাটা শুকিয়ে এল কেন?
 মাতৃভাষার প্রতি অবজ্ঞার কারণে। আমাদের ঘরের ছেলেমেয়েরা এখন ভালো বাংলা মিডিয়াম স্কুলে পড়ে না। মাতৃভাষাটা শেখে না। মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা না থাকলে শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় মানুষ। সংস্কৃতি নষ্ট হয়ে যায়। স্বাধীনতার আগে একজন শিক্ষিত বাঙালি ইংরেজিটা যেমন জানত তেমনি মাতৃভাষাটাও জানত। তখন ইংরেজের বিরোধিতা করা হত কিন্তু ইংরেজি ভাষার নয়। এখন কোনওটাই ভালো করে শেখে না। তার প্রভাব তো সংস্কৃতিতে পড়বেই। জেলার বাংলা মিডিয়াম স্কুলগুলো থেকে কিন্তু প্রচুর ভালো ছাত্রছাত্রী প্রতি বছর পাশ করে বের হয়। কিন্তু শিক্ষা-সংস্কৃতি পুরোটাই যেহেতু রাজধানী কলকাতা কেন্দ্রিক তাই তারা ব্রাত্যই থেকে যায়। বরাবরই তাই ছিল। তবে আশার কথা ইদানীং অনির্বাণ ভট্টাচার্য, কৃষ্ণেন্দু দেওয়ানজি, সত্রাজিৎ সরকার, কৌশিক কররা নাটকের পাশাপাশি সিনেমাতেও জায়গা পাচ্ছেন। কিন্তু যতদিনে এঁরা দাঁড়াবেন ততদিনে আমাদের সময় ফুরিয়ে যাবে। পরের প্রজন্ম হয়তো এঁদের পাবেন।
 রাজনীতির মূল্যবোধহীনতা কি বিকল্প ধারার সংস্কৃতির অবনতির একটা কারণ নয়?
 মূল্যবোধহীনতা কিন্তু শুধু রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়। সংবাদপত্র, শিল্প-সংস্কৃতি থেকে শুরু করে সমাজের সর্বস্তরেই রয়েছে। শুধুমাত্র রাজনীতিকে দোষ দেওয়াটা বোধহয় ঠিক হবে না। যখন থিয়েটার ছেড়ে দেব তখন এই বিষয়টা নিয়ে বিশদে বলব।
 ধন্যবাদ ব্রাত্য।
 ধন্যবাদ।

ছবি: বিশ্বজিৎ কুণ্ডু

 

নারীই শক্তি, মনে করায় প ঞ্চ ক ন্যা

আজকের সমাজে নারীর সঙ্গে প্রাগৈতিহাসিক যুগের নারীর অবস্থানের তুলনামূলক আলোচনা নিয়ে নির্মিত নাটক ‘পঞ্চকন্যা’ সম্প্রতি মঞ্চস্থ হল গিরিশ মঞ্চে। রামায়ণ-মহাভারতের পাঁচ নারী—অহল্যা, মন্দোদরী, কুন্তী, তারা ও দ্রৌপদীর মতো চরিত্র আজও আমাদের সমাজে রয়েছে। সময় পরিবর্তনে বদলে গিয়েছে তাদের চেহারা ও সাজগোজ। বর্তমান সময়ে আমরা তাদের অন্যরূপে দেখতে পাই। কিন্তু নারীর অবস্থান আজও সেই একই আছে। তারা যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রয়েছে। তাই এখনও আমাদের সমাজে নারীরা অহরহ অপমানিত, লাঞ্ছিত, অসম্মানিত ও পুরুষের কামনার শিকার হয়।
অথচ সৃষ্টির মূলেই রয়েছে একজন নারী। কখনও সে মাতৃরূপে, কখনও স্ত্রীরূপে, আবার কখনও সে কন্যা বা ভগ্নিরূপে অবতীর্ণ। পুরুষের প্রতি দায়িত্ব পালনে, কর্তব্যে, বিবেকবোধে, মর্যাদাবোধে কোথাও তারা কোনও অংশেই পিছিয়ে নেই। কিন্তু ওইসব পুরুষদের দ্বারাই নারী চরম অবহেলিত, অসম্মানিত হয়।
ধরা যাক অহল্যার কথা। কী দোষ ছিল তাঁর? চতুর দেবরাজ ইন্দ্রের ছলনায় তাঁকে স্বামী ভেবে সম্ভোগে সঙ্গ দিয়েছিল সেটাই তার অপরাধ। বিনা দোষে গৌতম মুনীর অভিশাপে সে পাথর হয়ে যায়। আবার রামের স্পর্শে সে মুক্তিলাভ করে। অগ্নিপ্রসূত কন্যা দ্রৌপদী নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে, আমি আমার জন্য, আমার কারণে কিছু পেয়েছি কখনও? আগুন থেকে আমার জন্য। আগুনের মতো জ্বলন্ত আমার অহঙ্কার, আমার ক্রোধ। আমি কি কোনওদিন আমার কর্তব্য পালনে অবহেলা করেছি? তবুও পঞ্চস্বামীর কেউ-ই আমাকে উপযুক্ত মর্যাদা দেয়নি। মন্দোদরী তার নিজের বুদ্ধিবলে সীতাকে রাবণের হাত থেকে রক্ষা করে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর বানপ্রস্থে চলে যায় কুন্তী, গান্ধারী আর ধৃতরাষ্ট্রের সঙ্গে। তার পুত্র কর্ণের মৃত্যু সে কোনওভাবেই মেনে নিতে পারে না। আবার ক্ষত্রিয়র ধর্ম পালনে পুত্রদের কৌরবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে উৎসাহিত করতে বাধ্য হয়। পুত্রদের রাজ্যলাভের পর অনেক অনুনয়, বিনয় স্বত্ত্বেও সে মহারানী হয়ে থাকতে অস্বীকার করে। কারণ, তার কাছে সুখের চেয়ে ত্যাগের মূল্য ছিল অনেক বেশি। কিষ্কিন্দার মহারানী তারা বাকচাতুর্য আর বুদ্ধি দিয়ে সুগ্রীবকে লক্ষ্মণের মহারোষ থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। এই পাঁচজন নারী আজও স্মরণীয়। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে তাদের নাম স্মরণ করা উচিত বলেই মনে করেন অনেকে। রামায়ণ মহাভারতের এই পাঁচটি চরিত্র একে একে উন্মোচিত হয় গল্প বলার ছলে। সংসার সমাজে তাদের ভূমিকাগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় নাটকে। তাই পতিব্রতা অহল্যা, স্নেহময়ী মাতা কুন্তী বা কর্তব্যপরায়ণ স্ত্রী দ্রৌপদী আজও কতটা প্রাসঙ্গিক সেটা বর্ণিত হয় নাটকে।
নাটকের শুরুতে দেখা যায় চারজন মহিলা একটি মৃতদেহ নিয়ে শ্মশানে ঢুকছে। সামনেই একজন সাধু বসে একটি মাটির প্রতিমা গড়ছে। মহিলারা সাধুকে দেখে জানতে চায়, পোড়ানোর কাঠ কোথায় পাওয়া যাবে? সাধুটি মহিলাদের দেখে বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করে তোমাদের সঙ্গে কোনও পুরুষ নেই? এর আগে শ্মশানে তো মহিলারা এভাবে মড়া পোড়াতে আসেনি। তোমরা কেন এসেছ? শুনে ক্রোধে জ্বলে ওঠে একজন মহিলা। সে বলে, পুরুষ বলে কিছু আছে নাকি সমাজে? তাহলে এই মেয়েটির এই অবস্থা হত? তখন সাধু তাদের কাছে জানতে চায়, মেয়েটির দুর্দশার কারণ কী? এবারে ওই মহিলারা তাকে মৃত মেয়েটির কথা বলে। মহাজনের টাকা শোধ না দিতে পেরে গ্রামের এক গরিব চাষি নিজের মেয়েকেই তুলে দেয় তার হাতে। সেই মহাজন বিয়ের নামে অমানবিক অত্যাচার চালায় মেয়েটির উপর। শুধু তাই নয়, দিনের পর দিন ওই পরিবারের অন্যান্য পুরুষরাও তাকে ভোগ করে। না খেতে পাওয়া ওই গরিব মেয়েটি তাদের অত্যাচারেই মারা যায়। তাকে ফেলে দেওয়া হয় আস্তাকুঁড়ে, শেয়াল কুকুর ছিঁড়ে খাবে বলে। একঘরে করে দেওয়ার ভয়কে উপেক্ষা করে শুধু একজন মহিলা এগিয়ে আসে। সমস্ত গ্রামের পুরুষদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। পরে তার সঙ্গে আরও তিনজন জুটে যায়।
এসব শুনে সাধু জানায়, নারীজন্ম কোনও পাপ নয়। পুরুষের শক্তি নারীই। আমাদের ইতিহাসের পাতা ওলটালে এমন বহু নজির পাওয়া যায়। তখন সাধু ওই পাঁচ নারীর কাহিনি শোনায়। মনে করিয়ে দেয় নারী কত শক্তিশালী। শ্যামা মায়ের রূপে তাদের নানা বর্ণনা দেয়।
ঐহিক প্রযোজিত এবং অরিন্দম রায় নির্দেশিত নাটকে সমাজে নারীর অবস্থানের কথাই বলা হয়েছে। ঐতিহাসিক নারীদের সঙ্গে বর্তমানের তুলনা করার বিষয়টি ভালো লাগে। স্বামী রায়ের সৃষ্টধর্মী ভাবনা সত্যিই প্রশংসনীয়। তাই কখনও নাটকটি একঘেয়ে লাগেনি দেখতে। ভালোলাগে প্রত্যেকের স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয়। বিশেষত সাধুরূপী অরিন্দম রায়, কুন্তীর চরিত্রে শ্রীময়ী মজুমদার, অহল্যার ভূমিকায় মৌমিতা মুখোপাধ্যায়কে। অন্যান্যরাও চরিত্রায়নে দক্ষতা দেখিয়েছেন। মঞ্চ, আবহসংগীত এবং উপযুক্ত স্তোত্রপাঠ নাটকটিকে বাস্তবরূপ দিতে সাহায্য করেছে। অভিনব সাজসজ্জাতেও রাবণ, সুগ্রীব, তারা ও মন্দোদরীকে দারুণ মানিয়েছে।

কলি ঘোষ

আবার মঞ্চে বিজনের ‘জবানবন্দি’

বাংলা নবনাট্য আন্দোলনের অন্যতম দিশারী বিজন ভট্টাচার্যের শতবর্ষ পেরিয়ে গেল। অথচ সেভাবে তাঁকে স্মরণ করে তাঁর কোন নাটক অভিনয় করেনি নাট্যদলগুলি। ব‌্যতিক্রম দু’একটি। ‘মানিকতলা দলছুট’ সেই ব্যতিক্রমীদের মধ্যে অন্যতম। তাদের প্রযোজনা বিজন ভট্টাচার্যের ‘জবানবন্দি’। এটি একটি ইতিহাস হয়ে যাওয়া নাটক। নাটকটি বিজন ভট্টাচার্য লেখেন ১৯৪৩ সালে। ‘অরণি’ পত্রিকায় এটি প্রকাশিত হয়। গণনাট্য সংঘের প্রযোজনায় ১৯৪৪ সালে এটি প্রথম মঞ্চস্থ হয়। এই নাটকের চরিত্র পরাণ মণ্ডল পঞ্চাশের মন্বন্তরের সময়কার এক চরিত্র। অন্নের অভাবে তো আর গ্রামে পড়ে থাকা যায় না। তাই অন্যান্য মানুষের মতোই পরাণ মণ্ডল খাদ্যের সন্ধানে তাঁর পরিবারকে নিয়ে গ্রাম ছেড়ে এসে আশ্রয় নিয়েছিল শহরের ফুটপাতে। অন্ন তো মেলেইনি, উলটে সম্ভ্রম খুইয়ে, শহুরে মানুষের লালসার শিকার হয়ে তারা আবার গ্রামে ফিরে যায়। আবার নতুন ফসলের গন্ধে ভরিয়ে তুলতে হবে গ্রাম। এই শপথে শেষ হয় নাটক। আজকের প্রেক্ষাপটে এই নাটক হয়তো তেমন প্রাসঙ্গিক নয়, তবে এই ইতিহাসের ফিরে দেখাটা খুব জরুরি ছিল। ‘জবানবন্দি’র শপথ যেখানে শেষ হচ্ছে, নবান্নের শুরু কিন্তু সেখান থেকেই। এই নাটক যেন নবান্নের ভূমিকার মতো। ‘মানিকতলা দলছুট’ সেই সময় এবং প্রাসঙ্গিকতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছে সার্বিকভাবে। অভিনয়ের মধ্যেও সেই পুরানো অভিনয়ের ধারাটাই অনুসরণ করার চেষ্ট করা হয়েছে। এই নাটক দেখতে দেখতে তাই মনে হয়েছে যেন আর্কাইভের মধ্য থাকা একটা সময়কে ফিরে দেখা। কোথাও মৌলিকতাকে সরিয়ে এই সময়কে জোর করে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়নি। এজন্য সংস্থার সকলকেই ধন্যবাদ জানাতেই হয়। বিভিন্ন চরিত্রে ভালো অভিনয় করেছেন কুমার, কেলভিন, সৌরভ, রঞ্জিতা, শম্পা, রাজ, অতসী, মৃত্যুঞ্জয়। বিজয় ভট্টাচার্য পরিচালনার আগে ভালো হোমওয়ার্ক করেছেন।

সন্দীপন বিশ্বাস

নববারাকপুর কোরাসের অয়দিপাউস ও নিয়তি

নববারাকপুর কোরাস থিয়েটারের নতুন প্রযোজনা ‘অয়দিপাউস ও নিয়তি’ মঞ্চস্থ হতে চলেছে আগামী ১৯ জানুয়ারি গিরিশ মঞ্চে। গ্রিক নাট্যকার সোফোক্লেসের লেখা কালজয়ী এই নাটকের বাংলা রূপান্তর ও সম্পাদনা করেছেন দেবাশিস্‌ ঩মৈত্র। পরিচালনাও তাঁরই। সোফোক্লেস তাঁর নাটকে দেখিয়েছেন, মানবসমাজের নিয়মবিধি যাই হোক নিয়তিই সবথেকে বড় সত্য। নিয়তি কেন বাধ্যতে। নিয়তিকে কেউ উপেক্ষা করতে পারে না। তাই রাজা অয়দিপাউস সর্বশক্তিমান হয়েও নিয়তির কাছে পরাজিত হন। নিজেই উপড়ে ফেলেন নিজের দুই চোখ...

নিজস্ব প্রতিনিধি

 প্রবীণ নাট্যকর্মীকে সংবর্ধনা

বাংলা নাটকের ইতিহাসে বীণা মুখোপাধ্যায় এক প্রায় বিস্মৃত নাম। ১৯৬৩ সালে তিনি যোগ দিয়েছিলেন নান্দীকারে। সেই সময় নাটককে ভালোবেসে এবং অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহচর্যে একের পর এক নাটক করে গিয়েছিলেন। ‘নাট্যকারের সন্ধানে ছ’টি চরিত্র’, ‘শের আফগান’, ‘মঞ্জরী আমের মঞ্জরী’, ‘তিন পয়সার পালা’, ‘ভালো মানুষ’, ‘সওদাগরের নৌকা’, ‘আন্তিগোনে’, ‘পাপপুণ্য’, ‘বাসভূমি’ সহ অসংখ্য নাটকে তিনি অভিনয় করেছেন। অভিনয় করেছেন ‘সুবর্ণলতা’ ও ‘ওগো প্রিয়তমা’ সিরিয়ালে এবং ‘কোনি’ চলচ্চিত্রে।
এই প্রবীণ নাট্যকর্মীকে সম্প্রতি সংবর্ধনা জানাল ভারতীয় গণনাট্য সংঘের উত্তর ২৪ পরগনার দেশবন্ধুনগর শাখা। বাগুইআটির জনকল্যাণ সমিতির প্রাঙ্গণে তাঁকে সম্মান জানান কবি শঙ্খ ঘোষ। উপস্থিত ছিলেন সাহিত্যিক দেবেশ রায়।

নিজস্ব প্রতিনিধি












©Copyright Bartaman Pvt Ltd. All rights reserved
6, J.B.S. Haldane Avenue, Kolkata 700 105
 
Editor: Subha Dutta